সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গণতন্ত্র ও ইমাম গাজালী

ইসলামপন্থীদের মধ্যে যারা গণতন্ত্রের পক্ষে, তাঁরা বলেন, গণতন্ত্র হলো এখনকার সময়ের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি। কারণ, গণতন্ত্র ছাড়া অন্য যে পদ্ধতিগুলো আছে, সেটা হয় রাজতন্ত্র না হয় স্বৈরতন্ত্র। এ উভয় তন্ত্রই গণতন্ত্রের চেয়ে খারাপ। সুতরাং, গণতন্ত্রই আমাদের জন্যে সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।

অন্যদিকে, যারা গণতন্ত্রের বিপক্ষে, তাঁরা বলেন, গণতন্ত্র হলো অধিকাংশ মানুষের পদ্ধতি। আর, কোর’আনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্ত ভ্রান্ত হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন –

وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ
“যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথামত চল, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। তারা তো কেবল অনুমানের অনুসরণ করে, এবং তারা কেবল অনুমান ভিত্তিক কথা বলে।” [সূরা ৬/আরাফ - ১১৬]

গণতন্ত্রপন্থী এবং গণতন্ত্র বিরোধী উভয়ের যুক্তিই শক্তিশালী। তাই উভয়ের মাঝে একটি সেতুবন্ধন করা প্রয়োজন। এবং এ কাজটি ইমাম গাজালী করে গিয়েছেন।

ইমাম গাজালীর মতে, গণতন্ত্রের মতোই অধিকাংশ মানুষের মতের ভিত্তিতে নেতা বা ইমাম নির্বাচিত হবেন। তবে প্রাথমিকভাবে নেতাকে মনোনয়ন দেয়ার জন্যে পাঁচটি শর্ত রয়েছে। ১) পুরুষ হওয়া, ২) খোদাভীতি থাকা, ৩) সুশিক্ষিত হওয়া ৪) কর্মদক্ষ বা কাজে যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া ৫) কোরাইশ বংশের হওয়া।

ইমাম গাজালীর মতে, যে কেউ নির্বাচনের জন্যে প্রার্থী হতে পারে না। যাদের উপরোক্ত পাঁচটি গুণ রয়েছে, কেবল তাঁরাই নির্বাচনের জন্যে প্রার্থী হিসাবে মনোনীত হতে পারে। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশেও এমন নিয়ম রয়েছে। যে কেউ ইচ্ছে করলেই নির্বাচনের জন্যে প্রার্থী হতে পারেন না, কিছু শর্ত রয়েছে। যেমন, অশিক্ষিত, অসৎ, দুর্নীতিবাজ ও ঋণখেলাপিদের নির্বাচনের জন্যে মনোনয়ন দেয়া হয় না।

ইমাম গাজালী নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নের জন্যে এমন দুটি শর্তারোপ করেছেন, যা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন কমিশনার দেখে না।
১) প্রার্থীকে কোরাইশ বংশের লোক হওয়া। কিন্তু, বর্তমানে আমাদের দেশে কোরাইশ বংশের কোনো লোক পাওয়া যাবে না; আর পাওয়া গেলেও তাদের মাঝে অনেক ভেজাল থাকবে। সুতরাং, এ শর্তটি আপাতত বাদ।

২) নেতা হবার জন্যে কেবল পুরুষরা মনোনয়ন পাবে। আমাদের দেশে সংসদে নারীদের জন্যে সংরক্ষিত আসন রাখা হয়েছে। কারণ, নারীদেরকে মনোনয়ন দিলেও তাঁরা প্রায় সময় পুরুষদের বিপরীতে নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন না। এ ছাড়া, আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক দেশেও নারীদেরকে রাষ্ট্রপতি করার পক্ষে নয় জনগণ। এ জন্যেই গত নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে জনগণ ভোট দেয়নি। সুতরাং, এ শর্তটি অঘোষিতভাবে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশেও পালিত হয়।

ইমাম গাজালির মতে, উপরোক্ত পাঁচটি গুনের অধিকারী মানুষের সংখ্যা যদি অনেক হয়, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের সমর্থনপুষ্ট ব্যক্তি-ই রাষ্ট্রপ্রধান বা নেতা হবেন। এবং কেউ যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের বিরোধিতা করেন, তাহলে সে বিদ্রোহী হিসাবে বিবেচিত হবে। [সূত্র, এহইয়া, ১ম খণ্ড, ২৩৫]

ইমাম গাজালীর মূল টেক্সটটা আমি এখানে দিয়ে দিচ্ছি। উপরোক্ত তত্ত্বের সাথে মিলিয়ে নিতে পারেন।

أن شرائط الإمامة بعد الإسلام والتكليف خمسة الذكورة والورع والعلم والكفاية ونسبة قريش لقوله صلى الله عليه وسلم الأئمة من قريش وإذا اجتمع عدد من الموصوفين بهذه الصفات فالإمام من انعقدت له البيعة من أكثر الخلق والمخالف للأكثر باغ يجب رده إلى الانقياد إلى الحق [إحياء علوم الدين 1/ 115]

ইমাম গাজালীর নেতা নির্বাচনের যে পদ্ধতি, সেটার সাথে গণতন্ত্রের-ই সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে। নির্বাচনের জন্যে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার সময়ে নির্বাচন কমিশনার যদি সৎ, কর্মদক্ষ, শিক্ষিত ও খোদাভীরু প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে অধিকাংশ জনগণ যাকেই ভোট দিক না কেন, নির্বাচিত প্রার্থী তাঁর জনগণকে সঠিক পথেই পরিচালিত করবেন। তখন কোর’আনের আয়াতের সাথে গণতন্ত্রের কোনো বিরোধ আর হবে না। এভাবেই ইমাম গাজালী গণতন্ত্রপন্থী ও গণতন্ত্র বিরোধীদের মাঝে একটি সেতুবন্ধন করেছেন।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একনজরে রূহ, প্রজ্ঞা, জ্ঞান, হৃদয়, মন, দেহ, কামনা, নফস, শয়তান

মানব শরীর অনেক জটিল প্রক্রিয়ায় কাজ করে। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষের জন্যে একজন ফেরেশতা ও একজন শয়তান নিয়োগ করেন। ফেরেশতা মানুষের রুহের সাথে সম্পর্কযুক্ত, এবং শয়তান মানুষের নফসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আল্লাহ ও ফেরেশতাদের বার্তাগুলো 'রূহ' নামক ডাকপিয়ন বিবেকের সাহায্যে মানুষের হৃদয়ের কাছে পাঠায়। এবং শয়তানের বার্তাগুলো 'হাওয়া' নামক ডাকপিয়ন নফসের সাহায্যে মানুষের হৃদয়ের কাছে পাঠায়। হৃদয় হলো মানুষের রাজা। সে কখনো নফসের বার্তা অনুযায়ী কাজ করে, আবার, কখনো রূহ ও বিবেকের বার্তা অনুযায়ী  কাজ করে। হৃদয় যখন নফসের কথা শুনে, তখন সে অন্ধকার ও অজ্ঞতার দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু হৃদয় যখন রূহের বার্তা শুনে, তখন সে আলো ও জ্ঞানের দিকে ধাবিত হয়। বিবেক হলো জ্ঞানকে কাজে লাগানোর যন্ত্র। অনেক মানুষের জ্ঞান আছে, কিন্তু বিবেক না থাকায়, সে রূহের নির্দেশনা বুঝতে পারে না। দেহ ও প্রাণ আলাদা জিনিস। মানুষ ছাড়াও অন্য প্রাণীদের দেহ ও প্রাণ রয়েছে। কিন্তু, রূহ ও শয়তান কেবল মানুষের জন্যেই নিযুক্ত করা হয়েছে।

নারী কি পুরুষের পাঁজরের হাড়?

“নারীদেরকে পুরুষের পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে” – এ কথাটি আমরা প্রায়ই শুনি। ইসলামকে বিতর্কিত করার জন্যে অনেকেই এ কথাটি বলে থাকেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইসলাম ধর্মের কোথাও এ কথাটি নেই। এটি হলো খ্রিস্টান ধর্মের একটি কথা। বাইবেলে বলা হয়েছে – Then the LORD God made a woman from the rib he had taken out of the man, and he brought her to the man. [Bible, New International Version, Genesis,Chapter 2, Verse 22] “স্রষ্টা পুরুষের পাঁজর থেকে একটি হাড় নিয়ে তা দিয়ে একজন নারীকে সৃষ্টি করেছেন। এবং তিনি নারীটিকে পুরুষের সামনে উপস্থিত করলেন।“ বাইবেলের এই লাইনটির ব্যাখ্যায় খ্রিস্টানগণ বলেন, আল্লাহ তায়ালা প্রথম আদম (আ)-কে সৃষ্টি করেছেন। এরপর আদমের পাঁজর থেকে একটি হাড় সংগ্রহ করেন। তারপর তা থেকে হাওয়া (আ)-কে সৃষ্টি করেন। খ্রিস্টানদের এ কথাটি এখন মুসলিম সমাজে খুবই পরিচিত। কিন্তু এর কারণ কি? মূলত, রাসূল (স) –এর একটি হাদিসকে কোর’আনের সাহায্যে ব্যাখ্যা না করে, বাইবেলের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলেই এ সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছে।

ইহুদী ও খ্রিস্টান শরিয়তের মধ্যবর্তী শরীয়ত ইসলাম

ইহুদি শরিয়তের নিয়ম হলো - কেউ আপনাকে একটি ঘুষি দিলে, আপনিও তাঁকে আরেকটি ঘুষি দিতে হবে। এখানে ক্ষমা করার কোনো সুযোগ নেই। আর, খ্রিষ্টান শরিয়তের নিয়ম হলো - কেউ আপনাকে একটি ঘুষি দিলে, আপনি তাকে আরেকটি ঘুষি দিতে পারবেন না, তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে। ইসলাম হলো এ দুটি শরিয়তের মধ্যপন্থী একটি শরিয়ত। যে কোনো অন্যায়ের শাস্তি প্রদান করার ক্ষেত্রে ইসলাম মানুষকে একটি স্বাধীনতা দেয়। কেউ আপনাকে একটি ঘুষি দিলে, হয় আপনি তাকে হুবহু আরেকটি ঘুষি দিতে পারেন, অথবা, অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন - وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ ۖ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِّلصَّابِرِينَ "যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তবে ঐ পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়েছে। আর, যদি সবর কর, তাহলে তা সবরকারীদের জন্যে উত্তম।" [সূরা ১৬/ নাহাল - ১২৬] ইসলামি শরিয়াহ পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো আইন হবার পিছনে কারণ হলো, ইসলাম মানুষকে দুটি অপসন দেয়। হয় প্রতিশোধ, না হয় ক্ষমা। এ ক্ষেত্রে ক্ষমা করে দেয়ার জন্যে ইসলাম সুপারিশ করে।