সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

উলিল আমর কারা?

আল কোর’আনের সূরা নিসার ৫৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে –

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَأُو۟لِى ٱلْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَـٰزَعْتُمْ فِى شَىْءٍۢ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ ۚ ذَ‌ٰلِكَ خَيْرٌۭ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا


“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর। রাসূল ও উলিল আমরের আনুগত্য কর। এরপর যদি তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ ঘটে, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের নিকট ফিরে যাবে; যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতকে বিশ্বাস কর। এটাই তোমাদের জন্যে সুন্দর ও উত্তম উপায়”। [সূরা ৪/নিসা – ৫৯]
.
এ আয়াতটি অনুবাদ করার সময় অনেকেই ‘উলিল আমরের’ অর্থ করেন – ‘নেতা’। কিন্তু উলিল আমরের অর্থ যদি “নেতা” করা হয়, তাহলে কোর’আনের অন্য একটি আয়াতে সাথে বৈপরীত্য তৈরি হয়। কেননা, কেয়ামতের দিন জাহান্নামীরা আল্লাহর নিকট অভিযোগ করে বলবে – “আমরা আমাদের নেতার আনুগত্য করেছিলাম বলে তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।”

وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَا
“হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের বা মুরব্বীদের কথা মেনে নিয়েছিলাম, তাই তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল”। [সূরা ৩৩/আহযাব – ৬৭]
:
তাহলে এখানে উলিল আমরের সঠিক অর্থ কি হবে?
____________
উলিল আমর [أُو۟لِى ٱلْأَمْرِ ] দুটি শব্দ – উলিল ও আমর। উলিল শব্দের অর্থ অধিকারীগণ, অভিভাবকগণ, বা, সহযোগীগণ। “আমর” শব্দটি কোর’আনে অসংখ্য অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন –
:
কোর’আনে সবচেয়ে বেশি ‘আমর’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে “কাজ” অর্থে। মানুষ যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার জন্যে ওয়াদাবদ্ধ হয়, তখন সেই কাজের কর্মকর্তাকে উলিল আমর বলা হয়।
[সূত্র – কোর’আন, ২৪: ৬২]
.
‘আমর’ শব্দের দ্বিতীয় অর্থ হলো ওহী বা আল-কোর’আন। যারা কোর’আনের অধিকারী বা কোর’আনের জ্ঞানে জ্ঞানী তাদেরকে ‘উলিল আমর’ বলা হয়।
[সূত্র – কোর’আন, ২১: ৭৩]
.
‘আমর’ শব্দের তৃতীয় অর্থ হলো ইসলামী শরিয়াহ বা ইসলামী আইন। যারা ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ বা বিচারকার্য পরিচালনা করেন, তাদেরকে ‘উলিল আমর’ বলা হয়।
[সূত্র – কোর’আন, ৪৫: ১৮]
.
‘আমর’ শব্দের চতুর্থ অর্থ হলো আদেশ। যারা আদেশ করার ক্ষমতা রাখেন, তাদেরকে ‘উলিল আমর’ বলা হয়। আল্লাহ ও রাসূল (স)-এর পর একজন মানুষকে আদেশ করার সর্বাধিক অধিকারী হলেন তার মা ও বাবা।
[সূত্র – কোর’আন, ১৯: ৩২; ৬: ১৫১]
.
‘আমর’ শব্দের পঞ্চম অর্থ হলো রূহ। রূহের অধিকারী স্বচ্ছ ও সুন্দর হৃদয়কে ‘উলিল আমর’ বলা হয়।
[সূত্র – কোর’আন, ১৭: ৮৫]
.
কোনো ধরণের প্রতিদানের আশা না করে যারা আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকে, তাদেরকেও ‘উলিল আমর’ বলা হয়।
[সূত্র – কোর’আন, ১০: ৭২; ৩: ১০৪]
.
সমাজের যে কোনো জ্ঞানী মানুষদেরকেও ‘উলিল আমর’ বলা হয়।
[সূত্র – কোর’আন, ৫২: ৩২; ২১: ৭]
____________

সুতরাং, ‘উলিল আমর’ হলো – কোর’আনের জ্ঞানে জ্ঞানী, সাধারণ জ্ঞানের জ্ঞানী, ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ, স্বার্থহীন সৎকাজের আদেশকারী, কোনো কাজের দায়িত্বশীল, মাতা-পিতা, শিক্ষক, এবং নিজের আকল-বুদ্ধি।
.
কোর’আনে ‘উলিল আমরের’ এমন অনেক অর্থ রয়েছে। আমরা যখন ‘উলিল আমরকে’ শুধু ‘নেতা’ বা শুধু ‘দায়িত্বশীল’ অর্থে সীমাবদ্ধ করে ফেলি, তখন কোর’আনের অন্য আয়াতের সাথে বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়।
.
ইসলাম পালন করার ক্ষেত্রে উপরে উল্লেখিত যে কোনো উলিল আমরের সাথে যদি কখনো আমাদের মতবিরোধ সৃষ্টি হয়, তখন অন্ধভাবে তাদের আনুগত্য না করে সরাসরি আল্লাহ ও তার রাসূল (স)-এর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একনজরে রূহ, প্রজ্ঞা, জ্ঞান, হৃদয়, মন, দেহ, কামনা, নফস, শয়তান

মানব শরীর অনেক জটিল প্রক্রিয়ায় কাজ করে। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষের জন্যে একজন ফেরেশতা ও একজন শয়তান নিয়োগ করেন। ফেরেশতা মানুষের রুহের সাথে সম্পর্কযুক্ত, এবং শয়তান মানুষের নফসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আল্লাহ ও ফেরেশতাদের বার্তাগুলো 'রূহ' নামক ডাকপিয়ন বিবেকের সাহায্যে মানুষের হৃদয়ের কাছে পাঠায়। এবং শয়তানের বার্তাগুলো 'হাওয়া' নামক ডাকপিয়ন নফসের সাহায্যে মানুষের হৃদয়ের কাছে পাঠায়। হৃদয় হলো মানুষের রাজা। সে কখনো নফসের বার্তা অনুযায়ী কাজ করে, আবার, কখনো রূহ ও বিবেকের বার্তা অনুযায়ী  কাজ করে। হৃদয় যখন নফসের কথা শুনে, তখন সে অন্ধকার ও অজ্ঞতার দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু হৃদয় যখন রূহের বার্তা শুনে, তখন সে আলো ও জ্ঞানের দিকে ধাবিত হয়। বিবেক হলো জ্ঞানকে কাজে লাগানোর যন্ত্র। অনেক মানুষের জ্ঞান আছে, কিন্তু বিবেক না থাকায়, সে রূহের নির্দেশনা বুঝতে পারে না। দেহ ও প্রাণ আলাদা জিনিস। মানুষ ছাড়াও অন্য প্রাণীদের দেহ ও প্রাণ রয়েছে। কিন্তু, রূহ ও শয়তান কেবল মানুষের জন্যেই নিযুক্ত করা হয়েছে।

নারী কি পুরুষের পাঁজরের হাড়?

“নারীদেরকে পুরুষের পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে” – এ কথাটি আমরা প্রায়ই শুনি। ইসলামকে বিতর্কিত করার জন্যে অনেকেই এ কথাটি বলে থাকেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইসলাম ধর্মের কোথাও এ কথাটি নেই। এটি হলো খ্রিস্টান ধর্মের একটি কথা। বাইবেলে বলা হয়েছে – Then the LORD God made a woman from the rib he had taken out of the man, and he brought her to the man. [Bible, New International Version, Genesis,Chapter 2, Verse 22] “স্রষ্টা পুরুষের পাঁজর থেকে একটি হাড় নিয়ে তা দিয়ে একজন নারীকে সৃষ্টি করেছেন। এবং তিনি নারীটিকে পুরুষের সামনে উপস্থিত করলেন।“ বাইবেলের এই লাইনটির ব্যাখ্যায় খ্রিস্টানগণ বলেন, আল্লাহ তায়ালা প্রথম আদম (আ)-কে সৃষ্টি করেছেন। এরপর আদমের পাঁজর থেকে একটি হাড় সংগ্রহ করেন। তারপর তা থেকে হাওয়া (আ)-কে সৃষ্টি করেন। খ্রিস্টানদের এ কথাটি এখন মুসলিম সমাজে খুবই পরিচিত। কিন্তু এর কারণ কি? মূলত, রাসূল (স) –এর একটি হাদিসকে কোর’আনের সাহায্যে ব্যাখ্যা না করে, বাইবেলের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলেই এ সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছে।

ইহুদী ও খ্রিস্টান শরিয়তের মধ্যবর্তী শরীয়ত ইসলাম

ইহুদি শরিয়তের নিয়ম হলো - কেউ আপনাকে একটি ঘুষি দিলে, আপনিও তাঁকে আরেকটি ঘুষি দিতে হবে। এখানে ক্ষমা করার কোনো সুযোগ নেই। আর, খ্রিষ্টান শরিয়তের নিয়ম হলো - কেউ আপনাকে একটি ঘুষি দিলে, আপনি তাকে আরেকটি ঘুষি দিতে পারবেন না, তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে। ইসলাম হলো এ দুটি শরিয়তের মধ্যপন্থী একটি শরিয়ত। যে কোনো অন্যায়ের শাস্তি প্রদান করার ক্ষেত্রে ইসলাম মানুষকে একটি স্বাধীনতা দেয়। কেউ আপনাকে একটি ঘুষি দিলে, হয় আপনি তাকে হুবহু আরেকটি ঘুষি দিতে পারেন, অথবা, অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন - وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ ۖ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِّلصَّابِرِينَ "যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তবে ঐ পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়েছে। আর, যদি সবর কর, তাহলে তা সবরকারীদের জন্যে উত্তম।" [সূরা ১৬/ নাহাল - ১২৬] ইসলামি শরিয়াহ পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো আইন হবার পিছনে কারণ হলো, ইসলাম মানুষকে দুটি অপসন দেয়। হয় প্রতিশোধ, না হয় ক্ষমা। এ ক্ষেত্রে ক্ষমা করে দেয়ার জন্যে ইসলাম সুপারিশ করে।